”অথচ একজন শিল্পীর মধ্যে সিংহহৃদয় থাকার কথা ছিল”

[প্রথম প্রকাশঃ ৬ই ডিসেম্বর,২০১৫, টকিজ/ বণিক বার্তা]

photo-7
মানিকগঞ্জে “কাগজের ফুলের” লোকেশনের খোঁজে তারেক মাসুদ ও কামার আহমাদ সাইমন

প্রায় এক যুগ আগের কথা। প্রেক্ষাগৃহে ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রটি দেখে তারেক মাসুদকে ঘিরে আগ্রহ শুরু। পরে পরিচয়, বন্ধুত্ব এবং শেষমেশ ‘কাগজের ফুল’ ছবির সহকারী পরিচালক হিসেবে একসঙ্গে কাজ করা। তারেক মাসুদের ৬০তম জন্মদিনে তাকে নিয়ে বললেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত এ প্রজন্মের তরুণ নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন—

আমাদের উত্তরাধিকার

শিল্প-সাহিত্য, বিশেষ করে প্রাচ্যের শিল্প-সাহিত্যের মধ্যে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে পরম্পরা। আমাদের অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের পাঁচ কিংবা ১০ হাজার বছরের যে উত্তরাধিকারের ইতিহাস, সে হিসেবে চলচ্চিত্র নবীনতম। এজন্যই শিল্পকলার অন্য মাধ্যমের কাছে এটি ঋণী। আমরা চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে ‘মুখ ও মুখোশ’ কিংবা অন্য কোনো ছবির নাম বলি, কিন্তু একজন নির্মাতার উত্তরাধিকার হিসেবে যদি দেখতে চাই, তাহলে এই বাংলার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে জহির রায়হান থেকে আলমগীর কবির, আলমগীর কবির থেকে তারেক মাসুদ— এখানে কিন্তু কেবল জহির রায়হান কিংবা আলমগীর কবিরের কথা বলছি না, বলছি তাদের প্রজন্মের কথাও; যেখানে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেলসহ আরো অনেকেই রয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পরম্পরার বিষয়টি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একজন জহির রায়হান যখন জহির রায়হান হিসেবে তৈরি হন, একজন আলমগীর কবির যখন আলমগীর কবির হয়ে ওঠেন কিংবা একজন তারেক মাসুদ তার ১০, ১৫ কিংবা ২০ বছরের যাত্রায় যে ক্ষেত্রটা তৈরি করেন, তাদের ঘিরে যখন আমাদের দাবির জায়গা তৈরি হয় বা তাদের কাছ থেকে প্রজন্মের অনেক কিছু পাওয়ার থাকে, ঠিক সে রকম একটা সময়ে এরা প্রত্যেকে চলে গেছেন। তাই দেখা যায়, নতুন প্রজন্ম যখন চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে কথা বলছে, সে উদাহরণ হিসেবে ইরানি কিংবা লাতিন সিনেমাকে টানছে। কারণ তার উত্তারাধিকারের যাত্রাটা বাধাগ্রস্ত। সেই থেকে চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা খোঁজার ক্ষেত্রে আমাদের চরম শূন্যতা। অসময়ে তারেক মাসুদের মতো একজন নির্মাতার চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই।

শিল্পের দায়বদ্ধতা

কেবল বাণিজ্য অর্থে না, চলচ্চিত্র একটা শিল্প। এটি নির্মাণে কত টাকা খরচ হলো বা কত ব্যবসা করল, তার বাইরেও চলচ্চিত্রের শিল্প পরিচয় রয়েছে। তারেক মাসুদ-উত্তর সময়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, এটা যেন আমরা ভুলেই গেছি। শিল্পমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের যে একটা সত্তা আছে, তা নিয়ে এখন কেউ খুব একটা কথা বলেন না। গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা তাই শুধুই হয় লাভ-লোকসান, নয়তো তারকাকে ঘিরে। চলচ্চিত্রের কালোত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি বাদই দিলাম। আমরা ভাবি না, আজ যে ছবিটি মুক্তি পেল, আগামী বছর এর নামটি কেউ মনে রাখবে কিনা। এই যে শৈল্পিক দৈন্য, কনটেন্টের দৈন্য— এটা তারেক মাসুদ-পরবর্তী সময়ে আরো ভয়াবহভাবে প্রকট হয়েছে। আমরা চলচ্চিত্র নিয়ে এখন শুধু দুটো কথা বলি। এক. ছবিটি কত কোটি টাকা বাণ্যিজ্য করল; দুই. এটি কয়টি উত্সবে গেছে কিংবা পুরস্কৃত হয়েছে। চলচ্চিত্র হিসেবে এর শৈল্পিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কতটুকু, তা আমাদের প্রজন্ম ভুলে গেছে কিংবা ভুলিয়ে দেয়া হচ্ছে। ধরা যাক ‘রানওয়ে’, এ ছবির কনটেন্টের দিকে তাকালে আমরা দেখি, বিশ্বজুড়ে বর্তমান যে অস্থিতিশীলতা— আজ থেকে সাত বছর আগে একজন নির্মাতা হিসেবে তারেক মাসুদ তা অনুমান করেছিলেন। তাই ছবিটি নিয়ে তিনি কিন্তু কোনো উত্সবে কিংবা বাণিজ্যিক মাধ্যমে যাননি। দেশের জেলায় জেলায় ঘুরে ছবিটির প্রদর্শনী দেখিয়েছেন, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে বাহাসে অংশ নিয়েছেন। যাদের জন্য তিনি ছবিটি নির্মাণ করেছেন, তাদের কাছে তিনি তা পৌঁছে দিয়েছেন। এখানেই একজন নির্মাতার পরিপূর্ণতা।

প্রজন্মের সংকট

আমাদের প্রজন্মের সময় কম। আমরা রাতারাতি জগদ্বিখ্যাত হয়ে যেতে চাই। একজন তারেক মাসুদের তারেক মাসুদ হয়ে ওঠার প্রস্তুতিমূলক সময় থেকে শুরু করে পরিণত হওয়া— যাত্রাটা কিন্তু ২৫ বছরের। সেই ২৫ বছরের যাত্রায় তাকে ঘাত-প্রতিঘাত-অভিঘাত অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা-আরোহণ-আবাহনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নিজেকে বারবার ভেঙে গড়তে হয়। এ স্থিরতার জায়গাটা বেশির ভাগ নির্মাতা খুঁজতেই চান না, তার আগেই মোহের কাছে হার মেনে যান। খুব কম নির্মাতাই আছেন, যারা এ স্থিরতা ধরে রাখতে পারেন, নিজের শিল্পীসত্তা খুঁজে পান। বর্তমান প্রজন্মে এ স্থিরতার অভাব রয়েছে। আর সেজন্য ব্যক্তি একা দায়ী নন, আমাদের চারপাশের সামাজিক অবস্থাও দায়ী। বহুজাতিক বাণিজ্যের মেলা-খেলায় শিল্পীর ঘাড়ে লোভের প্রেতাত্মারা ভর করে, এসএম সুলতান বা তারেক মাসুদদের মতো ছয় ফুট শরীর তাই আর আকাশ ছোঁয় না আজকাল খুব একটা।

কালোত্তীর্ণ শিল্প

যদি বলি আপনার বুকসেলফ থেকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহিদুল জহির, মাহমুদুল হকের বইগুলো সরিয়ে ফেলুন। দেখুন— কেমন ফাঁকা লাগে। জনপ্রিয় অনেক শক্তিশালী লেখকের ক্ষেত্রেও কিন্তু এটা হবে না। ঠিক তেমনি ‘মুক্তির গান’, ‘মাটির ময়না’, ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘রানওয়ে’ সরিয়ে দেখেন, আমাদের চলচ্চিত্র কোথায় থাকে। সাহিত্য কিংবা চলচ্চিত্র, যা-ই হোক, এটি বাদ দিলে যদি কোনো শূন্যতা তৈরি না হয় তাহলে তা কোনো শিল্পকর্মই না। আমি বলছি না সব শিল্পকর্মকে কালোত্তীর্ণ হতে হবে, কিন্তু একজন জাত শিল্পী কখনো সফলতার পেছনে ছোটেন না, তার চিন্তা-চেতনায় থাকে সার্থকতা। এখানেই তারেক মাসুদরা এই প্রজন্ম থেকে আলাদা। আমরা প্রথমে জানতে চাই ছবিটি কি পুরস্কার পেয়েছে? ছবিটা কী হলো, এ নিয়ে খুব একটা কথা শুনি না। এজন্য কিন্তু শুধু নির্মাতাকে দায়ী করলে হবে না; দর্শক, সমাজ, গণমাধ্যম সবারই কমবেশি দায় আছে।

তারেক মাসুদের অভাব

আমাদের প্রজন্ম আজব এক হীনম্মন্যতা নিয়ে বড় হচ্ছে। নির্মাতার কাজ তৈরি করা, গণমাধ্যমের কাজ প্রচার। কিন্তু একজন নির্মাতা যখন চিত্কার করে নিজেকে জাহির করতে থাকেন, তখন তিনি আসলে নিজের দীনতাই প্রকাশ করেন, আর বাকি সব নির্মাতাকে ছোট করেন। অথচ একজন শিল্পীর মধ্যে সিংহহূদয় থাকার কথা ছিল, ভেতরে আগুন থাকার কথা ছিল…, যেটা তারেক মাসুদদের প্রজন্মের ছিল! এ জায়গাটায় তারেক মাসুদকে মিস করি।

Advertisements
”অথচ একজন শিল্পীর মধ্যে সিংহহৃদয় থাকার কথা ছিল”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s