“জীবনের শৈল্পিক প্রকাশের জন্য মগ্ন-চৈতন্যে শিস দিতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই” ~ জাহীদ রেজা নূর

[প্রথম প্রকাশঃ ১৭ই জানুয়ারি, ২০১৩, আনন্দ/প্রথম আলো] 

জাহীদ রেজা নূর: উপ-ফিচার সম্পাদক, প্রথম আলো

Screenshot_2018-07-18 শুনতে কি পাও টুকরো ভাবনা

কামার আহমাদ সাইমন এটা কী তৈরি করলেন? এটা কি শুধুই প্রামাণ্যচিত্র? সত্যিই কি প্রামাণ্যচিত্র নাম দিয়ে শুনতে কি পাও বিষয়ে কথা বলা যায়? এটা তো কোনো গুরুগম্ভীর বিষয়ে গুরুগম্ভীর মানুষদের গভীর তাত্ত্বিক বয়ান নয়!সাদামাটা জীবনকে ততধিক সরলভাবে তুলে আনার মুনশিয়ানায় দর্শকেরমনে ওঠে উথালপাতাল ঢেউ। ছবিটি দেখতে বসলে আর বাহ্যজ্ঞান থাকে না। অন্তর-বাহির তখন কেবল চলমান ছবির রঙে রাঙা হয়ে ওঠে।

২০০৯ সালের ২৭ মে ‘আইলা’ নামের রুষ্ট প্রকৃতির সদম্ভ খেলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় হাজারো মানুষ। সুতারখালী গ্রামে তাঁদেরই একটি অংশের বসবাস। এই মানুষদের বেঁচে থাকার অবিরাম সংগ্রামের সেলুলয়েড-মুক্তি মনকে বিষণ্ন করে যেমন, তেমনি তা আশাবাদের শীর্ষবিন্দুতেও নিয়ে যায়। ভোলা থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত ছুটে বেড়ান সাইমন। মাসের পর মাস বসে থাকেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ দেখার জন্য। ফিরে আসেন ঢাকায়। আবার চলে যান সুতারখালী গ্রামে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর তাঁর ও ক্যামেরার উপস্থিতি যখন কাউকে আর প্রভাবিত করে না, তখনই ক্যামেরা সচল হয়। যেভাবে, যখন যিনি কথা বলেন, সেভাবে, তখন তিনি ধরা পড়েন ক্যামেরায়।

রাখী, সৌমেন আর চার বছর বয়সী রাহুলকে ঘিরেই ছুটে চলে ছবি। কিন্তু প্রচ্ছদপটে এ তিনজন থাকলেও সুতারখালী গ্রামের সব ছিন্নমূল মানুষই দ্রবীভূত হয় মেঘের রঙে রাঙানো সচল ছবিতে। জীবনের যত ছোট ছোট অদরকারি বিষয় আছে, তার সবকিছুই দেখতে পাই আমরা। চশমা নিয়ে দুই শিশুর গর্বমাখা উপস্থিতি, কাঠের খেলনা গাড়ি চালানো, মোবাইল ফোন কেনা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, লিপস্টিক কেনা, টয়লেট তৈরি করা…অদরকারি—কিন্তু শক্তিশালী হয়ে ওঠে এই বিষয়গুলোই, ছবিটিকে একটি অখণ্ড কাব্যে পরিণত করে তা। হঠাত্ আসা বৃষ্টির জল বালতিতে সংরক্ষণ কিংবা সে জলে স্নানের দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হয় জীবনই শিল্প, জীবনের শৈল্পিক প্রকাশের জন্য মগ্ন-চৈতন্যে শিস দিতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। সুতারখালী গ্রামের বাঁধের ওপরে যে রুক্ষ, কষ্টকর ও সংগ্রামী জীবন যাপন, তাতেই রয়েছে শিল্প-শিখর।

সাইমন সময়ের সঙ্গে হেঁটেছেন। সরকারি সাহায্য পাওয়া না-পাওয়ার দ্বন্দ্ব, সবাই মিলে বাঁধ তৈরি করা ইত্যাদি এসেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। রাখী-সৌমেন-রাহুলের নিজের বাড়ি ফিরে আসার পর তুমুল ঝড় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অবিরত যুদ্ধের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তারপরও এই ছবিতে প্রতিটি মানুষ যেন নিজেকেই খুঁজে পায়।

সাইমনের ক্যামেরা সাবলীলভাবে একটি কবিতা লিখেছে। আমস্টারডামের ইডফাতে, কিংবা জার্মানির লাইপজিগে ছবি প্রশংসা পেয়েছে। এটা খুবই আনন্দের কথা। কিন্তু তার চেয়ে বড় আনন্দ, বাংলাদেশেরই একটি গ্রামে প্রকৃতি ও মানুষের বোঝাপড়া আর দ্বন্দ্বকে সে দেশেরই রাজধানীর গণগ্রন্থাগার মিলনায়তনে দেখতে পেলাম, সেটা। ছবিটি আমাদের যেন রাঙিয়ে দিল। জানিয়ে দিল, বাংলাদেশের ক্যামেরাগুলোয় এখন স্পর্শ পড়ছে দক্ষ হাতের। এমন একটি পরিচ্ছন্ন দৃশ্যকাব্যের জন্ম দেওয়ার জন্য কামার আহমাদ সাইমন আর সারা আফরীনকে ধন্যবাদ।

“জীবনের শৈল্পিক প্রকাশের জন্য মগ্ন-চৈতন্যে শিস দিতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই” ~ জাহীদ রেজা নূর

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s