একজন আলু চাষী ও ছবির ফেরিওয়ালা

[প্রথম প্রকাশ ১৮ই এপ্রিল, ২০১৩/ রঙের মেলা/ কালের কণ্ঠ]
বিশ্বের প্রাচীনতম প্রামাণ্য উৎসব ডক লাইপজিগের ৫৫তম আসরের উদ্বোধনী রাতে 'শুনতে কি পাও!'এর বিশ্ব অভিষেকে প্রযোজক সারা আফরীন ও পরিচালক কামার আহমাদ সাইমন
‘আমাদের দেশের তরুণ নির্মাতারা বিদেশী উৎসবে যাওয়ার জন্য যতটুকু সচেষ্ট নিজের দেশে ছবি দেখানোর ক্ষেত্রে ততটুকু নয়’। ফেইসবুকের একটা ক্ষুদেবার্তায় এই মন্তব্যটা পড়ে মন খারাপ হয়ে গেলো। প্যারিসের দ্য গল এয়ারপোর্টে নেমে ট্যাক্সিতে করে হোটেলে যাচ্ছি, মাথায় ঘুরছে ‘শুনতে কি
পাও!’ নির্মাণের দিনপঞ্জী… ভদ্রা নদীর পাড়, সুন্দরবন… জলোচ্ছাসে ঘর বাড়ি হারানো একগ্রাম মানুষ আর স্বপ্নে বুঁদ উন্মাতাল তিনটি বছর। প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য ইউরোপের অন্যতম প্রামাণ্য উৎসব ‘সিনেমা দ্যু রিলে’এর মূল আর্ন্তজাতিক প্রতিযোগিতায় এসেছি ছবি নিয়ে। আর্ন্তজাতিক উৎসবে ‘শুনতে কি পাও!’ এর কিন্তু এটাই প্রথম প্রদর্শনী নয়। এর আগে বিশ্বের প্রাচীনতম প্রামাণ্য উৎসব জার্মানীর লাইপজিগের উদ্বোধনী ছবির সম্মান পেয়েছিল ছবিটি। প্রদর্শিত হয়েছে বৃহত্তম প্রামাণ্য আসর আমস্টারডামের ইডফাতেও। কিন্তু তবু মনের মধ্যে চাপা একটা কষ্ট উসকে দেয় ফেইসবুকের মন্তব্য, নিজের দেশে ছবিটি দেখাতে না পারার কষ্ট।

বিশ্বের প্রাচীনতম প্রামাণ্য উৎসব ডক লাইপজিগের ৫৫তম আসরের উদ্বোধনী রাতে ‘শুনতে কি পাও!’এর বিশ্ব অভিষেকে প্রযোজক সারা আফরীন ও পরিচালক কামার আহমাদ সাইমন

ফরাসী ভাষায় ‘সিনেমা দ্যু রিলে’ ইংরেজী অনুবাদ ‘সিনেমা অফ দ্য রিয়াল’, সাদা বাংলায় ‘আসল সিনেমা’। খোদ ফরাসী সরকারের সহযোগিতায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘পাবলিক ইনফরমেশন লাইব্রেরীর’ আয়োজনে বিগত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে আয়োজিত হয়ে আসছে এই জাঁদরেল প্রামাণ্য উৎসব। এ বছর মূল আর্ন্তজাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে বাংলাদেশের ‘শুনতে কি পাও!’ ছাড়াও ফ্রান্স, ইতালী, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কোস্টারিকা, চিলি ও চীন থেকে এসেছে আরও দশটি ছবি আছে। হোটেলে পৌছেই চটজলদি তৈরী হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম উৎসব ভেন্যু জর্জ পম্পিদ্যু সেন্টারের উদ্দেশ্যে। প্রদর্শনী শেষে শুরু হলো প্রশ্নোত্তর, ছবির বিষয়ের চাইতে নির্মিতির দিকে আকর্ষণ ‘প্যারিসিয়ানদের’ প্রতি শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে দিলো। একদিকে সারিবদ্ধ দর্শকের টিকেট কিনে ছবিঘরে ঢোকা দেখে পুলকিত বোধ করছি, অন্যদিকে নিজ দেশে ছবিটি দেখাতে না পারার কষ্ট মনে খুব পীড়া দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো সমস্যাটা কোথায়?

৩৫তম সিনেমা দ্যু রিলে, জর্জ পম্পিদ্যু সেন্টার, প্যারিস/ ছবিঃ রম্য রহিম
৩৫তম সিনেমা দ্যু রিলে, জর্জ পম্পিদ্যু সেন্টার, প্যারিস/ ছবিঃ রম্য রহিম

প্রথমত দেশের প্রচলিত পরিবেশনা ব্যবস্থাপনায় এফডিসি অথবা টেলিভিশন চ্যানেল প্রযোজিত ছবির বাইরে স্বাধীনধারায় নির্মিত ছবি প্রদর্শনের সুযোগ খুবই সীমিত। দ্বিতীয়ত ছবির দৈর্ঘ্য যদি আড়াই ঘন্টার নীচে হয় তাহলে কোন পরিবেশক বা প্রদর্শক এ নিয়ে কোন কথাই বলতে চান না (‘শুনতে কি পাও!’ এর দৈর্ঘ্য দেড় ঘন্টা)। তৃতীয়ত সাধারন দর্শকের প্রতি অজ্ঞতাপ্রসূত পরিবেশকদের উন্নাসিকতা ‘এ ছবি আমাদের দর্শকরা দেখবে না’। কিন্তু আমার প্রশ্ন আমাদের দর্শকরা দেখে না কি? যে দেশে দশকোটিরও বেশী জনগোষ্টীর বয়স চল্লিশের কম, যেখানে ইন্টারনেট সুবিধা নেয় কোটি কোটি মানুষ, যেখানে হলিউড বলিউডের সাম্প্রতিকতম ছবি থেকে শুরু করে নিরীক্ষাধর্মী উৎসবের ছবিগুলোর ডিভিডি বিক্রি হচ্ছে, ডাউনলোড হচ্ছে দেদারসে সেখানে দেশের একটা ছবি কেন চলবে না? হতে পারে এটা সব দর্শককে টানবে না, কিন্তু সব ক্রেতাকে টানে এরকম কোন তেল, সাবান বা মোবাইল ফোনও কি কেউ দেখাতে পারবেন? যে বাজারে আইফোন বিক্রি হচ্ছে, সেখানে সিম্ফনির সস্তা সেটও বিক্রি হচ্ছে। একের পর এক প্রথম সারির আর্ন্তজাতিক উৎসবে আমন্ত্রণ পাচ্ছে যে ছবি, বিশ্বের প্রথম সারির নির্মাতাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে পুরষ্কৃত হচ্ছে ‘শ্রেষ্ঠ ছবি’ হিসাবে… সে ছবির কি দেশে কোন দর্শকই নেই? সংকটটা কি ছবির? দর্শকের? নাকি বিপননের? একজন আলু চাষীর কাজ যদি হয় আলু চাষ করা, একজন মহাজনের কাজ যদি হয় চাষীর কাছ থেকে আলু কিনে বাজারে সরবরাহ করা, আর বাজারের একজন দোকানদারের কাজ যদি হয় খরিদ্দারের কাছে আলু বিক্রি করা – তাহলে আমাকে কেন নির্মাতা হিসাবে সবটা ভাবতে হবে? আমাদের দেশে মেধাবী নির্মাতার অভাব আছে আমি বিশ্বাস করি না, আমি এও বিশ্বাস করি না যে দেশটা শুধু শাকিব খান বা অনন্ত জলিলের দর্শকে ভর্তি! তাহলে প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রিকা প্রতিদিন সারা বিশ্বের মিডিয়ার খবর এত গুরুত্ব দিয়ে ছাপতো না। আসলে সব ছবিরই দর্শক আছে, নেই যা তাহলো যুগোপযোগী পরিবেশনা। হয় এর পরিবর্তন হবে, নয়তো বাজার সম্পূর্ণ চলে যাবে বিদেশী ছবির দখলে… যেমনটা হয়েছে আমাদের অন্য সকল মাধ্যমে। আর তাই বিদেশী বাজারে যাওয়ার জন্যে একজন তরুণ নির্মাতাকে যেমন দায়ী করা যাবে না, তেমনি স্বদেশীয় বাজার বলে যদি কিছু থাকে সেটা পরিবর্তন করতে হবে তার নিয়ন্ত্রক পরিবেশককে।

একজন নির্মাতার কাছে সবচাইতে বড় প্রাপ্তি হলো সাধারণ দর্শকের প্রতিক্রিয়া। এর জন্য প্রজেক্টর মাথায় নিয়ে ছবির ফেরিওয়ালা হয়ে ঘুরে বেড়াতে আপত্তি নেই আমার… কিন্তু প্রশ্ন হলো আমি কি নতুন ছবি বানানোর স্বপ্নে বিভোর হবো নাকি আগের ছবি দেখানোর লড়াইয়ে নামবো!
একজন আলু চাষী ও ছবির ফেরিওয়ালা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s