শুটিং এক্সার্প্টস্/ কে দেখবে এই প্রাকৃত ছবি!

'শুনতে কি পাও!' স্থিরচিত্র/ কামার আহমাদ সাইমন
‘শুনতে কি পাও!’ স্থিরচিত্র/ কামার আহমাদ সাইমন
ঘোর বর্ষায় সুন্দরবনের উপর ধেয়ে এসে নদীর পাড়ে আছড়ে পরে বৃষ্টি, সেই বৃষ্টির ছবি তুলবো বলে মাস-দিন-তারিখ-আবহাওয়া দেখে এসেছি শুটিঙে। একটু বৃষ্টি করেই দিনটা ফাঁকি দিয়ে চলে যায়, সহকারীরা বিরক্তি চেপে অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি ঠিক কীরকম বৃষ্টি তুলতে চাইছেন?’
আমি বোঝাতে পারি না, এড়িয়ে যাই, এটা সেটা তুলে সময় কাটাই, কিন্তু আমার তোলার মতো করে বৃষ্টি আর আসে না। চার-পাঁচ দিনের মাথায় সহকারী এসে বললো, আজকে দলের সবাই একটু ‘ব্রেক’ চাচ্ছে। দল বলতে শিক্ষানবিশ কয়েকজন, একবার এলে দ্বিতীয়বার আর আসতে চায় না। কথা না বাড়িয়ে বললাম ‘ঠিক আছে, প্যাক আপ’। ক্যাম্প থেকে একটু দূরে, বাঁধের উপর মন খারাপ করে বসে আছি। হঠাৎই দেখি জঙ্গলের উপর নীল আকাশটা ছাই হয়ে গেলো,মুহূর্তের মধ্যেই গোল হয়ে কালো মেঘ ধেয়ে আসছে! বাঁধের উপর এক গ্রাম মানুষ ছুটছে তাদের দৈনন্দিন তৈজস আর পোশাকাদি তুলতে, আর আমি ছুটছি ক্যাম্পের দিকে, ক্যামেরার জন্যে। মাটি, জল, কাদা আর পেছল ফেলে পাগলের মতো ভিজে ক্যাম্পে পৌঁছে দেখি : ক্যামেরা, ইকুইপমেন্ট সব ‘প্যাকড আপ’, ট্রাঙ্কে ঢোকানো; সহকারীরা সব বৃষ্টিতে গোসল করছে। তীব্র কষ্টে চোখ ঘোলা হয়ে এলো, মাথা তুলে বৃষ্টিতে মুখটা ধুয়ে নিলাম; শুধু মনটা বৃষ্টিতে ভিজে রইলো, এখনো।

 প্রতিদিন একটা যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে শুতে যাই, প্রতিদিন একটা নতুন যন্ত্রণা দিয়ে ঘুম ভাঙে। একদিন ঘুম ভেঙে শুনলাম ব্যাটারির চার্জার জ্বলে গেছে। চার্জার জ্বলাটা নতুন কিছু না, আগেও দু’একবার হয়েছে,  সাথে তাই একটা অতিরিক্ত চার্জার রাখা হয়, কিন্তু এবার দুটোই জ্বলে গেছে। দু’দিন বাদে পুজা, সনাতন গ্রামবাসীর বছরের  সবচাইতে আনন্দের সময় ছবি তুলতে পারবো না! ঢাকা গিয়ে আসতে সময় শেষ হয়ে যাবে, টাকাও প্রচুর দরকার। দু’জন সহকারীকে পাঠালাম চালনায়, একটা বিয়ে-বাড়ীর ভিডিও করা দোকান খুঁজে বের করে, দোকানীর হাতে পায়ে ধরে সারারাত চললো চার্জার নিয়ে লড়াই। ভোরের আলোয় ওরা ফিরলো হাসি মুখে, দুপুরে নষ্ট হলো জেনারেটর। মন খারাপ করে বসে আছি, এর মধ্যে গ্রামের একজন সাধারণ ছেলে এসে বললো, ‘ভাই, আমি একটু দেখি?’ আমি মাথা তুলে তাকালাম, দেখলাম লম্বা-দশাসই, অল্পশিক্ষিত একটি ছেলে, আমাদেরই প্রোডাকশনে নানান কাজ করে। আমি বললাম, ‘দেখো’, আবলুস কাঠ রঙের বিশাল শরীর ভাঁজ করে সে উবু হয়ে বসলো জেনারেটর নিয়ে। আমার চোখ আবার ভিজে এলো জলে। ভাবলাম, কি দরকার এই সব করে; সংস্কৃত, সাধু, চলিত, কথ্য শেষে এই অকথ্য সংস্কৃতির সময়ে কে দেখবে আমার এই প্রাকৃতজনের ছবি!

'শুনতে কি পাও!' স্থিরচিত্র/ কামার আহমাদ সাইমন
‘শুনতে কি পাও!’ স্থিরচিত্র/ কামার আহমাদ সাইমন
শহুরে সভ্যতার লোভে জর্জরিত সময়ে আত্মজনেরা প্রশ্ন তোলে, ‘কী করো তুমি?’। আমি নিরুত্তাপ চলে যাই সেইসব প্রাকৃতজনের খোঁজে। খুলনা থেকে বাসে নেমে ট্রলারে পাঁচ ঘন্টার নদীপথ। সুন্দরবনের ধারে প্রত্যন্ত উপকূল, বিশাল আকাশের নিচে দেখি ছোট ছোট সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনযাপন। ঋত্বিক ঘটকের তিতাস কিংবা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের চিরায়ত পদ্মার পার যেন এখানে থমকে আছে। এস এম সুলতান বোধ হয় এই সাহসী মানুষেরই ছবি এঁকেছিলেন, এখানেই কোথাও মরমী কবি বিজয় সরকারের বাড়ি। দিনের শেষে আলো নিভে এলে পরে এখানে এখনো ‘সন্ধ্যা’ দেয়া হয়; সস্তা সিগারেট, হারিকেনের আলো আর কেরোসিনের গন্ধে চায়ের দোকানে রাত হয় গভীর, রসালো। অমাবস্যার রাতে এখানে পথিকের পেছন লাগে ‘পুরো’ (অতৃপ্ত আত্মা), শিকার খুঁজে না পাওয়া বুড়ো বাঘের থাবায় উড়ে যায় এক খাবলা মাংস। আমার পৃথিবী থেকে এই বহুদূর দেশে নতুন মানুষ আমাকে ‘মানুষের’ সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমার শহুরে মন, চর্চিত মনন, অনুসন্ধিৎসু চোখকে লজ্জা দিয়ে জীবন এখানে এখনো যাপিত হয়, আমাকে ঔপন্যাসিক কলেবরের নেশায় বুঁদ করে দেয়, পূর্ণিমার ‘গোনে’ (জোয়ারে) রূপালী চিক্চিক্ নদীর তীরে আমি ছুটে বেড়াই এক গাছা দড়ি হাতে, ফড়িঙ আর দোয়েলের খোঁজে।
শুটিং এক্সার্প্টস্/ কে দেখবে এই প্রাকৃত ছবি!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s