বৃত্তের বাইরেই পরিধি অধিক বিস্তৃত

মানিকগঞ্জে
মানিকগঞ্জে “কাগজের ফুলের” লোকেশনের খোঁজে তারেক মাসুদ ও কামার আহমাদ সাইমন
একটা সময় ছিল ঢাকায়, যখন একটা উৎসব চললে সমস্ত চলচ্চিত্র পিপাসুদের পাওয়া যেত এক ঠিকানায়। আড্ডা আর চায়ের গুলতানিতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত হতো শিকড়, বৃত্তের বাইরেই বেশি বিস্তৃত হতো পরিধি। ছাত্র-শিক্ষক, যুবতী-তরুণ, শিল্পরসিক মধ্যবিত্ত আর
বাউন্ডুলেদের মিলনমেলায় অদৃশ্য অনুলিখনে চলতো এক অসম্পাদিত বাহাস। আমদের প্রজন্মে সেটা গিয়ে বাঁধা পরলো নির্দিষ্ট কিছু চত্বরে, মুক্তবাজারের দমকা হাওয়ায় কিছু দলছুট ছাড়া বাকি সব ইঁদুর-দৌড়ে ভোঁ-দৌড় আর ট্রাফিক-জ্যামে মানুষ হোল নগরবন্দি। অনেককাল বাদে যখন তারেক মাসুদের মতো চলচ্চিত্রকাররা এলেন, সিনেমার বাজার মূল্যের চাইতে সমাজ বোধের প্রশ্ন আবার সামনে চলে আসলো। আমাদের মতো কিছু উদ্ভ্রান্ত তরুণ ছুটে গেলাম সাথে সাথে…বর্তমানের সফলতম নির্মাতাদের থেকে শুরু করে, নবীনতম স্বপ্নবাজ পর্যন্ত সবাই। বাক্যে, বিতণ্ডায় খুঁজেছিলাম নিজেদের অবস্থান, পরিচয়। বিধাতার সেটা সহ্য হলো না, তিনি অন্তরালে হাসলেন… তারেক মাসুদ চলে গেলেন।
সেই শূন্যতা থেকেই ফিল্মী-বাহাসের অনুভব, তারেক মাসুদকে শ্রদ্ধাঞ্জলি… বিশ্ব সিনেমার শ্রেষ্ঠ নির্মাতাদের নিয়ে “তারেক মাসুদ মাস্টার্স ক্লাস”এর আয়োজন। কাব্যময় বাস্তবতার জন্য আন্তর্জাতিক উৎসব অঙ্গনে সুপরিচিত নাম ভিক্টর কসাকভস্কি, বার্লিন নিবাসী রুশ নির্মাতা ঢাকায় এসেছিলেন ‘তারেক মাসুদ মাস্টার্স ক্লাসের’ প্রথম আয়োজনে। সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের ডীন নীলোৎপল মজুমদারের সঞ্চালনায় দিনব্যাপী ভিক্টরের ছবির প্রদর্শনী, তার সাথে আড্ডা আর আলোচনায় এক শতেরও বেশি অংশগ্রহণকারীকে সাথে নিয়ে কেটেছিল একটা অন্য রকম দিন। আসছে ডিসেম্বরে এর দ্বিতীয় আয়োজন, আমন্ত্রিত এই সময়ের ফরাসী সিনেমার সবচেয়ে চ্যলেঞ্জিং নির্মাতা হিসাবে স্বীকৃত ক্লেয়ার ডেনি। ডিসেম্বরের ৮-৯ দুইদিনের আয়োজনে ডেনির ছবি আর প্রতিটা ছবির পর তার সাথে বাহাস চলবে ছায়ানট প্রাঙ্গণে সকাল থেকে সন্ধ্যা।
 
অনেকদিন থেকে শুনছি আমাদের চলচ্চিত্র আগাচ্ছে… কিন্তু শুধু ট্রিটমেন্ট ছাড়া, ফর্ম-কন্টেন্ট বা স্ট্রাকচার, কোনটাতেই তার কোন আলামত দেখতে পাচ্ছি না। চলচ্চিত্র শিল্পের নীতিমালাহীন ব্যবস্থাপনা, দূরদৃষ্টিশূন্য প্রযোজক-পরিবেশকের ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বন্দ্ব, ভারতীয় ছবির কাছে (পাইরেট ডিভিডি, ডাউনলোডের কল্যানে ইতিমধ্যেই) হারানো বাজার, আর মাল্টিপ্লেক্সে হলিউডী ছবির একচেটিয়া দোকানদারি – ‘অসম্ভবকে-সম্ভব’ করার সার্কাসকেই উস্কে দিচ্ছে। বাঁদর নাচের আদর এই গ্রাম-বাংলায় সব সময়ই ছিল, কিন্তু সেটা বড়জোর দশ মিনিটের… রাতভর কবির লড়াই বা বাউল গানের জায়গা সেটা কখনোই নিতে পারেনি। ডিজিটালে তামিল ছবির রিমেকের কি হাল হয়, সেটা এবার ঈদের ছবিতে দেখা গেছে। আবার লাতিন-ইরানিয়ান-কোরিয়ান ছবির অনুকরণ করলে সেটাও ইমিটিশনই হয়। বিপণন কৌশল আর মিডিয়ার উপর্যুপরি ব্যবহারে একটা কৃত্তিম উত্তেজনা হয়তো তৈরি করা যায়, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি  এগুলোতে এক ইঞ্চিও আগায় না… বরঞ্চ আরও পিছিয়ে যায়। তাহলে প্রশ্ন হলো আমাদের চলচ্চিত্র আগাবে কিভাবে? আমি বলি আগাবে, আগাবে সেইসব তরুণের হাতে যারা কপালের অদৃশ্য পাট্টায় এখনো লিখে বেড়ায়, ‘মানি না…!’ কারণ মানাটা তারুণ্যের স্বভাব না। বদলে দিবো বলে শুধু চিৎকার দিলেই হবে না, তার জন্য ফর্মুলার বাইরে আসতে হবে… ভাঙতে হবে, কিন্তু ভাঙ্গার আগে গড়াটাও জানতে হবে। কারণ আকাশের গভীরেই স্বপ্নের বাসা, গণ্ডীর বাইরেই নতুনের চারণভূমি, বৃত্তের বাইরেই পরিধি অধিক বিস্তৃত।
২০১০ কান উৎসবের জুরি প্রেসিডেন্ট, ফরাসী নির্মাতা ক্লেয়ার ডেনী ও কামার আহমাদ সাইমন, কথা ২য় তারেক মাসুদ মাস্টার্স ক্লাসে
ফরাসী নির্মাতা ক্লেয়ার ডেনী (২০১০ কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরী বোর্ডের প্রেসিডেন্ট) ও কামার আহমাদ সাইমন ২য় তারেক মাসুদ মাস্টার্স ক্লাসে
বৃত্তের বাইরেই পরিধি অধিক বিস্তৃত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s