…জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়!

চিত্রাবানী সিনেমা হল/ নড়াইল/ তারেক মাসুদ
চিত্রাবানী সিনেমা হল, নড়াইল/ তারেক মাসুদ
‘রানওয়ে’ ছবির কাজ তখন সবে শেষ হয়েছে, ‘কাগজের ফুল’ দ্বিতীয়বার শুরু হওয়ার একটা আলোচনা চলছে। তারেক ভাই বললেন, ‘আমি তার আগে রানওয়ে ছবিটা মানুষকে দেখাতে চাই’। তারেক মাসুদ ছবি বানিয়েছেন, সেটা সাধারণ মানুষকে দেখাতে চান – এতে সমস্যার কি আছে?
তারেক ভাই বললেন, ‘সমস্যা আছে, পরিবেশকরা তকমা দিয়ে গেছেন, এ ছবি আমাদের দর্শক খাবে না!’ সময়টা তখনকার যখন কিনা এক নায়ক নির্ভর দশটা ছবির প্রায় দশটা ছবিই ‘ফ্লপ’ হচ্ছে। ঘরে বসে কিংবা মফস্বলে চায়ের দোকানে ‘আমাদের দর্শকরা’ একরকম বিনা পয়সায় বিদেশী ছবি দেখছেন প্রতিদিন,শিক্ষিত তরুণ প্রতিনিয়ত ‘ডাউনলোড’ করে দেখছেন হালের হলিউডের ছবি, এফডিসিতে বাড়ছে বেকার পরিচালকের আড্ডা, প্রযোজকরা আর কোনদিন ছবি বানাবেন না বলে দিব্বি করছেন। এরকম একটা সময়ে ‘রানওয়ে’ ছবির প্রতি পরিবেশক-প্রদর্শকদের উন্নাসিকতায় খুব হতাশ হলাম, কিন্তু তারেক মাসুদ হলেন না। একরকম প্রজেক্টর কাঁধে নিয়ে তিনি বেড়িয়ে পড়লেন ‘রানওয়ে’ প্রদর্শনী করতে।
শিল্পী এবং শিল্পের দায়বদ্ধতা যখন এক বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায়, এ রকম একটা সময়ে জাতীর পরিচয়ে মৌলবাদের দুর্নাম সন্ধানে, সামাজিক বৈপরীত্য ও বৈষম্যের শেকড়ের খোঁজে তারেক মাসুদ তৈরী করেছিলেন ‘রানওয়ে’। রাষ্ট্র ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত অবিচার আর নির্যাতনে পথভ্রষ্ট এক তরুণের নতুন স্বপ্ন সন্ধানের গল্প নিয়ে দেশব্যাপী হাজারো তরুণের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টায় ছিলো তাঁর এই দেশব্যাপী প্রদর্শনী! এটাই প্রথম নয়, নব্বইয়ের দশকে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ যখন প্রায় এক ম্লান অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিলো তখনও তারেক মাসুদ ঠিক এভাবেই নিয়ে এসেছিলেন ‘মুক্তির গান’। শহর-বন্দর-গ্রামে টানা প্রায় চার বছর প্রদর্শন করেছিলেন জাতির এই মাহেন্দ্রক্ষণ, একাত্তর। তারেক মাসুদ ছিলেন শিল্পী এস এম সুলতানের ভক্ত, চিন্তাবিদ আহমদ ছফার শিষ্য এবং অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের বিশেষ অনুরক্ত। আর নির্মাতাদেরও তখন ‘তারকা’ হওয়ার কোন তাড়া ছিলো না। তাই ন্যুনতম শুভেচ্ছামূল্যে ‘রানওয়ে’ দেখতে আসা হাজারো তরুণের সাথে আড্ডায় তারেক মেতে উঠতেন নিমেষেই। আবার পথে যেই একটা সিনেমা হল পড়লো অমনি নেমে পড়লেন ক্যামেরা হাতে। চলচ্চিত্র শিল্পের রুটি-রুজির সাথে জড়িত অবহেলিত হল-কেন্দ্রিক  পেশাজীবিদের কাছে জানতে চাইলেন, বুঝতে চাইলেন এ শিল্পের গূঢ় কথা। স্বপ্ন ও সম্ভাবনার খোঁজে, আত্মজিজ্ঞাসায় ঘুরে বেড়ালেন ফরিদপুর থেকে খুলনা, নড়াইল, সিলেট; দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাহারী নামের সব হলে… স্টার, শঙ্খ, কাকলি, বৈকালী, মণিকা, ময়ূরী, সঙ্গীতা, বনলতা, চিত্রবাণী, লালকুঠি, উল্লাসিনী। কেউ অভিযোগ করলেন নির্মাতাদের অক্ষমতাকে, আবার কেউবা দায়ী করলেন অতি মুনাফালোভী কুরুচিপূর্ণ প্রযোজকদের। কেই আঙুল তুললেন সেন্সরবিহীন চ্যানেলগুলোর দিকে আবার কেউ দোষ দিলেন ডিশ লাইন, সত্তর টাকার পাইরেট সিডি আর কুড়ি টাকার মেমোরী কার্ডকে। যেখানে যত বিতর্ক, তারেক মাসুদের উৎসাহ সেখানে তত বেশী।
সঙ্গীতা সিনেমা হল, খুলনা/ তারেক মাসুদ
সঙ্গীতা সিনেমা হল, খুলনা/ তারেক মাসুদ
কানে ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইটে ‘মাটির ময়না’ জন্য শ্রেষ্ঠ ছবির ‘সমালোচক পুরষ্কার’ নিয়ে এসেছেন যে পরিচালক, ‘কাগজের ফুল’ ছবির মতো বিশাল ক্যানভাসের এক অসম্ভব স্বপ্নের লোভ দেখাচ্ছেন যিনি বারবার… তিনি এসে শুধু গল্প করছেন কোথায় কি দেখেছেন! শুনেছেন! একরকম বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এগুলো করে আপনার কি লাভ? প্রযোজক-প্রদর্শক-পরিবেশকদের কাজ আপনি কেন করছেন? তারেকের উত্তর, ‘কেউ কিছু করছে না! শুধু হল মালিকেরা অপেক্ষা করছে কবে হলগুলো ভেঙে শপিং কমপ্লেক্স বানাবে! অথচ বেশিরভাগই সিনেমা হলের জন্য জমি লীজ নেয়া। এতগুলো হল, এত বড় একটা ইন্ড্রাস্ট্রি, এতগুলো মানুষের জীবন, সব শেষ হয়ে যাবে? আমাদের কি কিছুই করার নেই?’ আমি বললাম, ‘পরিচালকের কাজ ছবি বানানো, আপনি ছবি বানান…’ তারেক ভাই উত্তর দিলেন, ‘ছবি দেখানোর  জায়গাই যদি না থাকে, তাহলে ছবি বানিয়ে কি লাভ? দেখাতেই যদি না পারি বানাবো কেন?’ হতবিহ্বল হয়ে ভাবতে লাগলাম… তাইতো! দেখাতেই যদি না পারি, বানাবো কেন!
 
কুষ্টিয়া ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শনী শেষে ঢাকা ফিরেই ফোন করলেন তারেক ভাই, বারশো আসনের মিলনায়তনে টানা তিনদিন হলভর্তি দর্শকে ‘রানওয়ে’ প্রদর্শনী করে মহা উত্তেজিত। বাড়ি গিয়ে দেখি পঞ্চান্ন বছরের এক যুবক টগবগ করছেন নতুন সব আইডিয়া নিয়ে… আর পনেরো বছরের কিশোর, পঁচিশ বছরের তরুণ, পয়ত্রিশ বছরের যুবক… সব মন্ত্রমুগ্ধের মতো  তাকিয়ে শুনছে। তারেক বলে চলেছেন, সময় চলে যাচ্ছে, আরও কি করতে হবে, আরও কত কিই না করার ছিলো… ‘জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়! এইসব ছুঁয়ে-ছেনে! – সে এক বিষ্ময়!’ কোনরকম প্রস্তুতি ছাড়া হুট করেই চলে গেলেন তারেক মাসুদ। স্বপ্ন-আদর্শহীন একটা অদ্ভুত সময়ে দূর-বন্ধুর পথের যাত্রায়, সস্তা জনপ্রিয়তাকে পায়ে ঠেলে যে অসম লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন সেটা অসমাপ্তই থেকে গেলো… থেকে গেলো কিছু স্বপ্ন, আর আগামী প্রজন্মের কাছে কিছু প্রত্যাশা।
…জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s