তারেক মাসুদের ‘না যাওয়া পথে’

স্পিডবোটে পদ্মায় তারেক মাসুদ ও কামার আহমাদ সাইমন/ ছবিঃ ক্যাথরিন মাসুদ
স্পিডবোটে পদ্মায় তারেক মাসুদ ও কামার আহমাদ সাইমন/ ছবিঃ ক্যাথরিন মাসুদ
কোথায় তারেক মাসুদের সঙ্গে আপনার দেখা হলো?
কামার: বেহালার সুর পুরো থিয়েটারটা ভরে উঠছিল, ছবির শেষে ‘মাটির ময়না’র কলা-কুশলীদের নাম উঠছিল পর্দা জুড়ে…দর্শকরা উঠে যাচ্ছিল আসন ছেড়ে তাড়া করে, কিন্তু আমি উঠতে পারছিলাম না,
পুরো শরীরটা যেন মাটিতে আটকে গেছে। আমি (‘শুনতে কি পাও!’ ছবির প্রযোজক) সারাকে বললাম, ‘কে এই পরিচালক? এতটা সংবেদনশীলতা! এই পরিমিতিবোধ! এটা কীভাবে সম্ভব? এটা তো বাংলাদেশের ছবি বলে মনেই হচ্ছে না! আমি তাকে দেখতে চাই, আমার তার সাথে কথা আছে…’ আমি সোজা চলে গেলাম তার কাছে, তিনি (তারেক) খোলা মনে আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন। কাছাকাছি এলাম মুগ্ধতায়, যেটা টিকে ছিলো একদম শেষ পর্যন্ত।
 
কাগজের ফুলে আপনি কীভাবে যুক্ত হলেন?
কামার: ‘কাগজের ফুল’ স্ক্রিপ্টটা নিয়ে তিনি (তারেক) অনেকদিন ধরে কাজ করছেন, আমি জানতাম। একদিন আমাকেও স্ক্রিপ্টটা পড়তে দিলেন। আমি তার বাড়িতেই তখন। আমরা মাত্র দুপুরের খাবার খেয়েছি একসাথে। দু’ঘণ্টার কিছু বেশি সময় লেগেছিল স্ক্রিপ্টটা শেষ করতে। এরপর তার ভাবনাগুলো আমাকে বলতে শুরু করলেন। কিছুদিন পর একদিন আমাকে বললেন, ‘এই ছবিটাতে আমার কিছু মেধাবী মগজ দরকার, তুমি কি ‘কাগজের ফুল’ এ আমার প্রধান সহকারী পরিচালক হবে?’ তারেক মাসুদের কাজের প্রক্রিয়া খুব কাছ থেকে দেখার লোভ আমার অনেকদিন থেকেই ছিলো, তার আলোকিত মুখের দিকে তাকিয়ে আমি উত্তর দিলাম- ‘হবো’।
 
তারেক মাসুদের কাছ থেকে শেখা সবচেয়ে সেরা বিষয়টা কী ছিলো?
কামার: ‘তুমি যেখানেই থাকো না কেন, যে পরিস্থিতিতেই থাকো না কেন, যদি তুমি ঠিক ঠিক খুঁজো, তাহলে তোমাকে হার মানতে হবে না…একটা অন্য সম্ভাবনা অবশ্যই আছে…একটা ভিন্ন রাস্তা নিশ্চয়ই আছে, যে রাস্তায় তোমার আগে হয়তো কেউ যায়নি।
 
তারেকের অজানা কোনও বিষয় বলবেন কি?
কামার: এর উত্তর ক্যাথরিন ভালো দিতে পারবেন। আমি যেটুকু মনে করতে পারি তারেক খেতে এবং রাঁধতে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু প্রচলিত অর্থে বাঙালি ভোজনরসিক না। নিখুঁত, পরিপূর্ণ এবং পরিমিত অর্থে। আসলে ‘পরিমিতি’ এবং ‘পরিপূর্ণতা’র প্রতি তার এই ভালোবাসাই তাকে ‘তারেক মাসুদ’ বানিয়েছিল।
 
কে বেশিদিন আপনার মনে টিকে থাকবে- মানুষ তারেক? নাকি চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক?
কামার: দুই বিচারেই একটু কঠিন মানুষ ছিলেন তারেক! মানুষ তারেককে বুঝতে গেলে অনেকটা সময় দিতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। এমনিতে বাইরে থেকে দেখলে তাকে খুব কঠিন মানুষ মনে হতো, কিন্তু একবার যদি তার ভেতরটা কেউ বুঝতো তাহলে এ এক অন্য জীবনদর্শন।
 
তারেক মাসুদের সাথে কাটানো শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত?
কামার: কাজের সূত্রে সেটা অনেকবারই হয়েছে। কিন্তু একটা বলতে গেলে, আমি বলবো পদ্মার কথা। আমরা প্রায়ই পদ্মা পাড়ি দিয়ে তার গ্রামের বাড়ি যেতাম। যেতাম সাধারণত স্পিডবোটে, সময় লাগতো বিশ মিনিটের মতো। পুরানো বোট-ইঞ্জিনের কানে তালা লাগানো শব্দ আস্তে আস্তে সয়ে আসতো। আর ঠিক তখনই চোখে পড়তো দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ, আছড়ে পরা ঢেউ, মাছধরা নৌকা, ডুবো চর, কাঁশফুল, নিঃশব্দে একসাথে কাটানো কয়েকটা মুহূর্ত, একেবারে সিনেমার মতো।
সবচেয়ে বেশি তারেকের কথা কখন মনে পড়ে?
কামার: যখন দেখি আমাদের প্রজন্মের নির্মাতারা তারেকের ‘না যাওয়া পথে’ হাটছে না। যখন আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের চারপাশে হট্টগোল শুনতে পাই। দিক দেখাবার কাউকে পাই না, সুবিধাবাদীরা চারপাশে দেখি দাপিয়ে বেড়ায়! কত টাকার ছবি, কত টাকা ব্যবসা করলো সেটাই যখন দেখি আসল হয়ে যায়। ছবিটা কতটা স্বার্থক, নির্মাণ কতটা স্বার্থক হলো সে প্রশ্ন যখন কেউ করে না, তখন।
 
তারেক মাসুদকে শেষ কোনও কথা বলার সুযোগ পেলে কী বলতেন?
তারেক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন মাত্র ৫৫ বছর বয়সে। কিন্তু একজন তারেক মাসুদকে ‘তারেক মাসুদ’ হয়ে উঠতে লেগেছে ২৫ বছর বা তারও বেশি  সময়। আমি সুযোগ পেলে তাকে অন্তত আরও কয়েকটা বছর বাঁচতে বলতাম, বিশেষ করে এই সময়টাতে যখন কিনা একটা ‘সফল ছবি’ আর একটা ‘স্বার্থক ছবি’র পার্থক্য আমরা প্রায় ভুলেই গেছি।
[বাংলা ট্রিবিউনের জন্য সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন শাদমা মালিক]
তারেক মাসুদের ‘না যাওয়া পথে’

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s